ইরানের দূতাবাস অবরোধ


ইরানের দূতাবাস অবরোধ


ইরানের দূতাবাস ৩০ এপ্রিল থেকে ৫ মে, ১৯৮০ সাল পর্যন্ত অবরোধ করা হয়। লন্ডনের সাউথ কেনসিংটনে ছয়জন সশস্ত্র ব্যক্তি ইরানের দূতাবাসে হামলা চালায়। বন্দুকধারীরা, যারা খুজেস্তন প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় ইরানি অঞ্চলের আরব কেএসএ গোষ্ঠীর সদস্য তারা আরব জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য প্রচারণা চালানোর উদ্দেশ্যে ২৬ জনকে জিম্মি করে। জিম্মিরা ছিল প্রধানত দূতাবাসের কর্মী, কিছু দর্শক এবং দূতাবাসের রক্ষণাবেক্ষণকারী একজন পুলিশ কর্মকর্তা। তারা খুজেস্তানের জেলখানা থেকে আরব বন্দীদের মুক্তি এবং যুক্তরাজ্য থেকে তাদের নিজেদের নিরাপদ রাস্তা প্রত্যাহারের দাবি জানায়। মার্গারেট থ্যাচারের সরকার দ্রুত সমাধান দেয় যে তাদেরকে নিরাপদ রাস্তা দেওয়া হবে না, এবং এর ফলে এই সংকট ঘনিভূত হয়। পরের দিনগুলিতে, পুলিশ সমঝোতার ভিত্তিতে ছোট ছোট সুবিধার বিনিময়ে পাঁচজন বন্দি মুক্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করে, যেমন একটি ছিল ব্রিটিশ টেলিভিশনে দখলদারদের দাবীগুলি সম্প্রচার করা।

অবরোধের ছয়দিনে বন্দুকধারীরা তাদের চাহিদা পূরণে অগ্রগতির অভাবের কারণে ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ে। সেই সন্ধ্যায়, তারা বন্দীদের মধ্যে একজনকে হত্যা করে এবং দূতাবাস থেকে তার শরীরকে ছুঁড়ে ফেলে। ফলস্বরূপ, সরকার ব্রিটিশ বাহিনীর একটি বিশেষ বাহিনী স্পেশাল এয়ার সার্ভিস (এসএএস) এর একটি রেজিমেন্টকেকে নির্দেশ দেয়, যাতে তারা অন্য জিম্মিকে উদ্ধারের জন্য আক্রমণ এবং অপারেশন নিমরোদ পরিচালনা করে। অল্প কিছুদিন পরে, এসএএস সৈন্যরা ভবনের ছাদ থেকে ছিটকে পড়ে জানালা দিয়ে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। ১৭ মিনিটের এই অভিযানের সময় তারা বাকি সব বন্দীদের মুক্ত করেছিলো এবং জিম্মিদের ছয় জনের মধ্যে পাঁচজনকে বন্দী করেছিল। পরে সৈন্যরা অপ্রত্যাশিতভাবে পাঁচজনের মধ্যে দুজনকে হত্যা করে। একমাত্র জীবিত বন্দুকধারীর বিচার করা হয় এবং ব্রিটিশ কারাগারে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়।

ইরান-ইরাক যুদ্ধ যে বছরের পর বছর ছড়িয়ে পড়েছিল এবং তেহরানের জিম্মি সংকটের পর ১৯৮১ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত চলমান ছিল, তারপরেও ইরানিরা সেই জিম্মি সংকট এবং তার কারণগুলি ভুলে গিয়েছিল। তবুও থ্যাচার খ্যাতি অর্জনের জন্য অপারেশন এসএএসকে প্রথমবারের মতো জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করে। এই হামলার সময় যে অগ্নিকাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছিল তা থেকে দূতাবাস বড় ক্ষতির সম্মুখীন হয় ফলে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত ইরান তাদের দূতাবাস পুনরায় খুলতে পারেনি।

পটভূমি

উদ্দেশ্য

জিম্মিকারীরা (ইরানি ডেমোক্রাটিক রেভোলুশনারি ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব অ্যারাবিস্তান (ডিআরএফএলএ) এর সদস্য) এবং ইরানী আরবরা খুজেস্তন প্রদেশের (অ্যারাবিস্তান নামেও পরিচিত) দক্ষিণ অঞ্চলে একটি স্বায়ত্তশাসিত আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবিতে সক্রিয় ছিল। তারা ছিল আরবি ভাষী সংখ্যালঘু গোষ্ঠী। এই তেল-সমৃদ্ধ অঞ্চল ইরানের রাজস্বের বেশিরভাগ আয়ের উৎস হয়ে ওঠেছিল, যা শাহের রাজত্বকালে বহু-জাতীয় সংস্থা দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল।

ওন আলী মোহাম্মদের মতে, আরব সার্বভৌমত্ব আন্দোলন দমনের চেষ্টা ছিল স্ফুলিংগের মতো যা তাদেরকে লন্ডনে ইরানের দূতাবাস আক্রমণের জন্য উৎসাহিত করেছিল। পরিকল্পনাটি ইরান জিম্মি সংকটের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিল, যেখানে বিপ্লবের সমর্থকরা তেহরানের আমেরিকান দূতাবাসের কর্মীদের আটক করেছিল।

লন্ডনে আগমন

ইরাকি পাসপোর্ট ব্যবহার করে, ওন এবং ডিআরএফএলএ এর তিনজন সদস্য ৩১ মার্চ ১৯৮০ সালে লন্ডনে এসেছিল এবং ইস্টারস কোর্টের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া করেছিল। তারা দাবি করে যে কাকতালীয়ভাবে বিমানে তাদের দেখা হয়। তারা সাধারণত শেষরাতে মাতাল হয়ে বাসায় ফিরতো, এবং কখনও কখনও পতিতা অনুষঙ্গী নিয়ে ফিরতো। এক সপ্তাহের মধ্যেই তাদের গৃহকর্মী তাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলো। তারা শীঘ্রই অন্য ফ্ল্যাটে স্থানান্তরিত হয়েছিলো, যেখানে তারা তাদের নতুন বাড়ির মালিককে জানিয়েছিল যে তাদের আসার কারণ হচ্ছে তারা অন্য পুরুষদের সাথে যোগ দিয়েছে এবং এ কারণে তাদের বৃহত্তর বাসস্থান প্রয়োজন। পরে কোনো এক দিন, এক অনুষ্ঠানে তাদের ফ্ল্যাটে দলটির সাথে প্রায় এক ডজন মানুষ যোগ দিয়েছিল।

ওয়ান ছিল ২৭ বছর বয়সী এবং খুজেস্তনের অধিবাসি; তিনি তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেছেন, যেখানে সে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। তিনি শাহের গোপন পুলিশ এসএভিএকে কর্তৃক গ্রেফতার হয়েছিলেন। তিনি বলেন, তাকে এসএভিএকে এর কারাগারে নির্যাতন করা হয়েছিল। তার দলের আরেক সদস্য শাকির আব্দুল্লাহ রাধিল, যিনি "ফয়সাল" নামে পরিচিত এবং ওয়ান এর সেকেন্ড ইন কমান্ড যিনিও সাভাক কর্তৃক নির্যাতনের অভিযোগ করেছিলেন। বলে দাবি করেন; শাকির সুলতান সাইদ, বা "হাসান"; আযমী মুহাম্মদ হুসেন, বা আব্বাস; ফোজি বাদাভি নেযাদ, বা "আলী"; এবং মক্কী হানুন আলী, "মক্কী" নামে পরিচিত।

৩০ এপ্রিল তারা তাদের বাড়ির মালিককে জানায় যে তারা এক সপ্তাহের জন্য ব্রিস্টলে গিয়ে ইরাকে ফিরে যাবেন এবং তাদের আর ফ্ল্যাট দরকার হবে না এবং ইরাকে তাদের মালামাল পাঠানো হচ্ছে। তারা ৩০ এপ্রিল ২০১০ রাত ৯:৩০ (বিএসটি) এ বাড়ির বাইরে চলে যান। তাদের প্রাথমিক গন্তব্য অজানা ছিল, কিন্তু ইরানের দূতাবাসের পথে তারা আগ্নেয়াস্ত্র (পিস্তল ও সাবমেশিনগান সহ), গোলাবারুদ এবং হাত গ্রেনেড সংগ্রহ করে। ধারণা করা হয় যে, অস্ত্রগুলি সোভিয়েত বাহিনীর এবং যুক্তরাজ্যে ইরাকের ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাগের মাধ্যমে চোরাচালান করা হয়েছে। বেলা ১১:৩০ এর আগে, দক্ষিণ কেনসিংটনের লেক্সহাম গার্ডেনের কাছাকাছি ফ্ল্যাট খালি করার দুই ঘণ্টা পরে, ছয়জন পুরুষ দূতাবাসের বাইরে আসে।

বিশেষ বিমান বাহিনী

বিশেষ বিমান বাহিনী বা স্পেশাল এয়ার ফোর্স (এসএএস) ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর একটি রেজিমেন্ট এবং যুক্তরাজ্যের বিশেষ বাহিনী অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চলাকালে ১৯৪১ সালে আফ্রিকার কর্নেল ডেভিড স্টার্লিং দ্বারা রেজিমেন্ট গঠিত হয়। এর মূল ভূমিকা ছিল প্রথমে উত্তর আফ্রিকাতে এবং এরপর ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে এবং দখলকৃত ইউরোপে শত্রুর অনুপ্রবেশ এবং বিমানঘাঁটিতে হামলা ঠেকানো এবং শত্রু অঞ্চলের তথ্য গভীরভাবে সরবরাহ করা। স্টার্লিং বেশ কয়েকটি ছোট দল ব্যবহার করে, সাধারণত চারজন পুরুষের দ্বারা আক্রমণ চালানোর নীতিটি প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তারা বুঝতে পেরেছিল যে চারজন পুরষের দল শত শত সৈন্যের একটি ইউনিটের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকরী হতে পারে।

"মিউনিখ হত্যাকাণ্ড" এর পর পশ্চিমা সরকারগুলো বিশেষ সন্ত্রাসবিরোধী ইউনিট গঠন করতে অনুরোধ জানায়। ১৯৭২ সালের অলিম্পিকের সময়, কিছু জিম্মিকারী এবং পশ্চিম জার্মান পুলিশ দলের মধ্যে একটি আগ্নেয়াস্ত্র যুদ্ধ সংঘটিত হয় ফলে একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং সকল জিম্মি নিহত হয়। ব্রিটিশ সরকার চিন্তিত ছিল কারণ যুক্তরাজ্যে তারা একই ধরনের সঙ্কটের জন্য দেশটি প্রস্তুত নয়, সরকার এসএএস এর কাউন্টার রিভল্যুশনারি ওয়ারফেয়ার (সিআরডব্লিউ) উইং গঠনের আদেশ দেয়, যা যুক্তরাজ্যের প্রাথমিক সন্ত্রাস ও ছিনতাই বিরোধী ইউনিট হয়ে ওঠে। ১৯৪৫ সাল থেকে এসএএস বিদেশে জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অংশগ্রহণ করে এবং প্রভাবশালী নাগরিক যাদের মৃত্যু ব্রিটিশ স্বার্থের বিপরীত হবে তাদের দেহরক্ষীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করে। এভাবে, পুলিশ বা অন্য কোনো সশস্ত্র বাহিনীর কোনও ইউনিটের চেয়ে শক্তিশালী ভূমিকা পালনের জন্য আরও ভালভাবে প্রস্তুত করা হয় বলে মনে করা হয়। সিআরডব্লিউ উইং এর প্রথম কার্যকর অভিজ্ঞতা ছিল ১৯৭৭ সালে লুফথানসার ফ্লাইট ১৮১ এর হামলা, তখন জিএসজি ৯ -এর সহায়তায় সৈন্যদের একটি ছোট গ্রুপ পাঠানো হয়েছিল, ১৯৭২ সালের ঘটনাবলির পরে অভিজাত ওয়েস্ট জার্মান পুলিশ ইউনিট গঠন করা হয়েছিল।


অবরোধ

প্রথম দিনঃ ৩০ এপ্রিল

এসএএস কর্তৃক আক্রমণ

ফলাফল

দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব

Collection James Bond 007

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে

  • হু ডেয়ারস উইন (চলচ্চিত্র)
  • সিক্স ডে'স (চলচ্চিত্র)
  • রেইনবো সিক্সঃ সেইজ, ২০১৬ সালের একটি সন্ত্রাসবিরোধী ভিডিও গেম, ইরানের দূতাবাস অবরোধ এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক জিম্মি উদ্ধার অপারেশন গবেষণা ব্যবহার করে গেমটি নির্মাণ করা হয়, যা গেমটিকে অনেকাংশে সঠিক করে তোলে।

আরও দেখুন

  • স্পেশাল এয়ার সার্ভিস

টীকা

তথ্যসূত্র


ইরানের দূতাবাস অবরোধ


Langue des articles



Quelques articles à proximité

Non trouvé